নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীতে শিক্ষার কিছু বিকল্প ভাবনা

নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীতে শিক্ষার কিছু বিকল্প ভাবনা

মো. রমজান আলী: নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ বর্তমান বিশ্বের এক আতংকের নাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে এই অবস্থাকে মহামারীর হিসেবে ঘোষণা করেছে। যা সারা বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। UNESCO-র তথ্য মতে বিশ্বে ১৬০ দেশেরও অধিক দেশ তাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। যার ফলে সারা বিশ্বের ৮৭% শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ্ হচ্ছে এবং ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। যা অত্যন্ত চিন্তা ও ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশের মত একটি দেশের জন্য যা অত্যন্ত আতংকের বিষয় তো বটে! বাংলাদেশ সরকার ১৮ থেকে ৩১ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে তা ৯ মার্চ পর্যন্ত বর্ধিত করেছে যা আরও বর্ধিত হতে পারে। এই দীর্ঘ বন্ধে প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৩৯‌,৯৩৬,৮৪৩ জন শিক্ষার্থী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন সময় যাতে করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যাঘাত না হয় তার জন্য সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ই-পাঠদানের (ভিডিও ক্লাস) মাধ্যমে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জুম অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থার কথা ভাবছে। যা দ্রুত শুরু করা অত্যন্ত জরুরী।

কিন্তু এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে পাঠদান করার জন্য আমরা কতোটা প্রস্তুত? এই মাধ্যমগুলো দিয়ে পাঠদান করতে গেলে কিছু সমস্যার কথা প্রথমেই অনুমান করা যায় তা হলঃ অনেক শিক্ষার্থীর বাসায় টিভি, রেডিও বা মোবাইল ফোন এর কোনটাই নেই, অনেক শিক্ষার্থী আছে যার ইন্টারনেট সংযোগ নেই বা অনেক ধীরগতি সম্পন্ন। তাহলে এই শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা কিভাবে পাঠদান নিশ্চিত করবো?

এক্ষেত্রে আমাদের যা করতে হবে তা হল- প্রতিটি শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের অবস্থা যাচাই করবে; তার শিক্ষার্থীরা এই মাধম্যেগুলোর মাধ্যমে পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না তা যাচাই করবে। তাদের সমস্যাগুলো এবং বিকল্প উপায়গুলো চিহ্নিত করবে। এই যেমন ধরাযাক কোন শিক্ষার্থীর বাসায় টিভি, রেডিও বা মোবাইল এর কোনটাই নেই। তাহলে সে কি করবে? সে কিভাবে পাঠদানে অংশগ্রহণ করবে? সংশ্লিষ্ট শিক্ষক এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে সহায়তা করবেন। যেমন- কিভাবে অন্যের সাহায্য নিয়ে পাঠে অংশগ্রহণ করবে তার ব্যবস্থা করে দিবে, কোন শিক্ষার্থীর সাথে জোড়া (টেগ) করে দিবে অথবা এলাকার মধ্যে যার বাসায় টিভি, রেডিও বা মোবাইল আছে এমন পরিবারে সাহায্য নিয়ে তার পাঠদানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সর্বক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে এবং শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

সরকার চিন্তা করছে একটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠদান পরিচালনা করবে। কিন্তু এটা কতটা যৌক্তিক বা লজিক্যাল? বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ১২০ এর অধিক পাঠ্যপুস্তক। ধরি ১২০টি পাঠ্যপুস্তক, এই শতাধিক বিভিন্ন বিষয়ের বা শ্রেনির পাঠদান কি একটি টিভি চ্যানেলের মাধম্যে আদো সম্ভব? অন্যদিকে সকল বিষয়ের পাঠদান কি জরুরী? তা বিবেচনার বিষয়। ধরি সকল বিষয়ে পাঠদান জরুরী না, এক্ষেত্রে কিছু অত্যাবশ্যক বিষয়ের ক্ষেত্রে পাঠদান তো অবশ্যই জরুরী। সকল শ্রেনির কিছু অত্যাবশ্যক বিষয়ের পাঠদান করতে গেলেও একটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে পাঠদান করা কষ্টসাধ্য বিষয় হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে একাধিক টিভি চ্যানেল ও রেডিও সেন্টারকে ব্যবহার করে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কখন কোন চ্যানেলে কোন শ্রেণির কোন বিষয়ের পাঠদান করা হবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে হবে এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। যাতে করে সকল শিক্ষার্থী সময়মত পাঠে অংশগ্রহণ করতে পারে। সাথে সাথে সকল শিক্ষার্থীর পাঠে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য পাঠের রেকর্ড বিভিন্ন মাধ্যমে বিস্তরণ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জুম অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইন্টারনেট সমস্যা এর পরেই যে সমস্যা আসে তা হচ্ছে ডিভাইসের (ল্যাপটপ/কম্পিউটার বা স্মার্ট ফোন নেই বা সমস্যাগ্রস্থ ডিভাইস) সমস্যা বা অপ্রতুলতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অনেক শিক্ষার্থীই তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ নেই বা অনেক ধীরগতি সম্পন্ন। এক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যা করতে পারে তা হল শিক্ষার্থীদের অবস্থা যাচাই করা, কতজন শিক্ষার্থীর জুম অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে সমস্যা হচ্ছে। ধারণা করা যাচ্ছে এই ধরণের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হবে না। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ কিছু প্রদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যেমন আশেপাশের কোন শিক্ষার্থীর সাথে জোড়া (টেগ) করে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটি কমন শেয়ার ড্রাইভ করতে পারে যেখানে পাঠগুলো সংরক্ষণ করতে পারে যাতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের সুবিধামত সময়ে ডাউনলোড করে পড়তে পারে। সর্বোপরি শিক্ষা হোক মুক্ত এবং উন্মুক্ত।

  • লেখক: উন্নয়নকর্মী ও প্রকল্প পরিচালক, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।



আরো খবর


Shares