1. selimnews18@gmail.com : একাত্তর এক্সপ্রেস :
  2. selim.bmail24@gmail.com : একাত্তর এক্সপ্রেস (টিম ২) : একাত্তর এক্সপ্রেস (টিম ২)
  3. asadzobayr@yahoo.com : Zobayr : আসাদ জোবায়ের
কমলগঞ্জে মণিপুরি তাঁত পল্লীতে দুর্ভোগে দেড় সহস্রাধিক তাঁতী
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫৫ অপরাহ্ন

কমলগঞ্জে মণিপুরি তাঁত পল্লীতে দুর্ভোগে দেড় সহস্রাধিক তাঁতী

সোহেল রানা
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২০
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা পাহাড় আর চা বাগান পরিবেষ্টিত পর্যটন এলাকা। উপজেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে অন্যতম মণিপুরী সম্প্রদায়। তাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের শৈল্পিক ও নান্দনিক ডিজাইন আজ দেশ ছাড়িয়ে ইউরোপ ও আমেরিকাতে স্থান করে নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ারে মণিপুরীরা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন। কমলগঞ্জ উপজেলার মণিপুরী অধ্যুষিত প্রায় ৩০টি গ্রামের ঘরে ঘরে তাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির করা হয়। কমলগঞ্জের ভানুগাছ বাজার, আদমপুর, মাধবপুর ও গুলেরহাওর এলাকায় মণিপুরী শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, বাঁশের কাজ করা সামগ্রী ও ব্যাগের দোকান খোলা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা কমলগঞ্জ প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন। কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর, মঙ্গলপুর, রাণীরবাজার, কালারায়বিল, ভানুগাছ, বালিগাঁও, ইসলামপুর, তিলকপুর, ঘোড়ামারা, কোনাগাঁও, ছনগাঁও, তেতইগাঁও, হকতিয়ার খোলা, জালালপুর, কেওয়ালীঘাট,ভানুবিল, বন্দেরগাঁও, কান্দিগাঁও, ছয়চিরী, ভান্ডারীগাঁও, গঙ্গানগর, মকাবিল, গুলেরহাওর, টিলাগাঁও, মাঝেরগাঁও, নয়াপত্তন, হীরামতি গ্রামসহ প্রায় ৩০টি গ্রামে মণিপুরীরা তাঁতীরা তাঁত বুনণের কাজ করেন । আদমপুর মণিপুরি কমপ্লেক্সের মণিপুরি তাঁতবস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান প্রশিক্ষক সৌদামনি সিন্হা জানান, এখানে ৭টি তাঁত ফ্রেম রয়েছে। কমপ্লেক্সে  ১৬ জন তাঁতী কাজ করেন। স্বাভাবিক সময় ৭টি তাঁত মেশিনে ডিজাইন ছাড়া মাসে ৭/৮টি ও ডিজাইন হলে ৩/৪টি কাপড় তৈরী করা যায়। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনায় ২৪ মার্চ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক তাঁত কারখানা বন্ধ রয়েছে। মৈতৈ, বিষ্ণুপ্রিয়া ও পাঙাল (মণিপুরি মুসলিম) ৩ সম্প্রদায়ের কমপক্ষে ১ হাজার তাঁতী নিজ বাড়িতে কোমর ও ফ্রেম তাঁতে কাজ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক কারখানায় কাজ বন্ধ থাকলেও তারা বাড়ির তাঁতে কাজ করছেন। বাজার বন্ধ থাকায় চাহিদা মতো সুতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাদের তৈরী তাঁতবস্ত্র বাজারজাতও করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে তারা মহাজনের কাছে আটকা রয়েছেন। সৌদামনি সিনহা আরোও বলেন, যে শাড়ির দাম আগে ১৪শ টাকা ছিল এখন মহাজনের কাছে ৯শ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তাও আবার সময়মত টাকা পাচ্ছেন না। তিনি আরো জানান,পুঁজি না থাকায় তারা শিল্পের প্রসার করতে পারছেন না।

এছাড়া উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য স্থায়ী দোকান প্রতিষ্টার দাবী জানান। আলাপকালে মণিপুরী মহিলা তাঁতি শুক্লা সিন্হা, সীমা সিন্হা, কস্তুরি সিন্হা, চিত্রালী সিন্হা জানান, তাঁতের কাপড়ের বাজারে চাহিদা থাকলেও কাঁচামালের অভাবে পাইকারি বিক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করতে পারেন না। কাঁচামাল না থাকায় অনেকে তাঁতের কাপড় বোনা বাদ দিয়েছেন বলে জানান। আরো জানান, মনিপুরি তাঁত কাপড়ের কাঁচামাল সিলেটে পাওয়া যায় না। ঢাকা, নরসিংদী কিংবা চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়।

জালালপুর গ্রামের বাঙালী তাঁতী নুরুন নাহার ও বন্ধেরগাঁও গ্রামের শারমিন আক্তার বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে তারাও মনিপুরি তাঁতবস্ত্র তৈরী করেন। আদমপুর ও ইসলামপুর ইউপিতে কমপক্ষে ৫শ বাঙালী তাঁতী রয়েছেন। তারা বর্তমান সময়ে বাড়িতে তাঁতবস্ত্র বুনন করলেও বাজারজাত করতে না পারায় তারা মহাজনের দয়ার উপর নির্ভরশীল। সুতার দাম তেমন না বাড়লেও তৈরী বস্ত্র বাজারে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে মহাজনের দেওয়া দামে বস্ত্র বিক্রি করতে হচ্ছে। তাঁতশিল্পীরা জানান, দেশ-বিদেশে বাহারি মণিপুরি পোশাকের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে।

এই শিল্প রক্ষা করতে আগে কাঁচামাল প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে আদমপুরের সূতা ব্যবসায়ী ও তাঁতবস্ত্র ক্রয়কারি মহাজন মজর আলী বলেন, সূতার দাম বাড়েনি। বাজার বন্ধ থাকায় তাঁতীরা তৈরী বস্ত্র বিক্রি করতে পারছেন না। তিনিও তৈরী বস্ত্র সামান্য মূল্য হাতে রেখে ক্রয় করছেন।

অন্যদিকে কমলগঞ্জের মণিপুরীদের তাঁতে উৎপাদিত বিভিন্ন সামগ্রী স্থানীয়ভাবে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্রয় করেন। এসব সামগ্রী আবার স্থানীয় গ্রামগুলোর দোকানগুলোতে বিক্রি করা হয়। কমলগঞ্জের ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কে মণিপুরী মার্কেট “চিত্রাঙ্গদা” মণিপুরি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এছাড়াও আদমপুর, মাধবপুরসহ বেশ কিছু মণিপুরি পোশাকের দোকান গড়ে উঠেছে। তাঁতের কাপড় ব্যবসায়ী  বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিংহ বলেন, কমলগঞ্জে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মণিপুরি তাঁতশিল্প প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র। কেন্দ্র থেকে মণিপুরী পরিবারের নারীরা তাঁতের কাপড় তৈরি শিখে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও চালু করেছে এসএমই ঋণ প্রকল্প। তার মতে, শুধু প্রশিক্ষন প্রদান ও তাঁত ঋন দিলেই চলবেনা  প্রয়োজন মণিপুরি কাপড়ের কাঁচামাল সহজলভ্য। প্রীতি মণিপুরী হ্যান্ডিক্রাফটসের স্বত্বাধিকারী এন প্রদীপ কুমার সিংহ জানান, তাঁতীদের রক্ষার জন্য সুদের হার কমিয়ে প্রকৃত তাঁতীদের ঋণ দিতে হবে। আলাদাভাবে ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
কমলগঞ্জ ক্ষুদ্রশিল্প উদ্যোক্তা সমিতির উপদেষ্ঠা আহমদ সিরাজ বলেন,বর্তমানের করোনাভাইরাসের কারণে বড় প্রভাব পড়েছে মণিপুরী ও বাঙালী তাঁতীদের উপর। এই ক্রান্তিকাল পার হওয়ার পর বাঙালী ও মনিপুরি তাঁতীদের মাঝে বিশেষ ক্ষুদ্রঋণ প্রদান না করলে তাদের এই শিল্পকে ঠেকানো যাবে না।
এ বিভাগের আরও খবর...

Comments are closed.